Skip to content
অ্যানাল ক্যান্সার

অ্যানাল ক্যান্সার: কীভাবে হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করবেন

অ্যানাল ক্যান্সার (Anal Cancer) হলো মলদ্বারের (Anus) ক্যান্সার, যা তুলনামূলকভাবে বিরল হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি। মলদ্বার আমাদের হজম প্রক্রিয়ার শেষ অংশ, যার মাধ্যমে শরীরের বর্জ্য পদার্থ নির্গত হয়। এই অংশের কোষগুলোতে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে টিউমার তৈরি হলে তাকে অ্যানাল ক্যান্সার বলা হয়।যত দ্রুত এটি শনাক্ত করা যায়, ততই চিকিৎসা সহজ এবং সফলতার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো — প্রাথমিক পর্যায়ে এর উপসর্গ অনেক সময় হালকা বা অন্য রোগের মতো দেখা দেয়, যেমন অর্শ (Piles) বা ফিশার (Anal fissure)। ফলে অনেকেই প্রথমে গুরুত্ব দেন না।

অ্যানাল ক্যান্সারের কারণ:

১. হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণ
  • অ্যানাল ক্যান্সারের সবচেয়ে বড় কারণ হল HPV, বিশেষ করে HPV টাইপ ১৬ ও ১৮।

  • HPV যৌন সংক্রমিত রোগ হিসেবে পরিচিত, যা অ্যানাল সেক্স, যৌনাঙ্গের ত্বকের সরাসরি সংস্পর্শ, বা অন্যান্য যৌন কার্যকলাপের মাধ্যমে ছড়ায়।

  • দীর্ঘমেয়াদে HPV সংক্রমণ অ্যানাল অঞ্চলের কোষে পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

২. যৌন আচরণ ও অভ্যাস
  • একাধিক যৌন সঙ্গী থাকা।

  • অ্যানাল যৌনসম্পর্কে যুক্ত থাকা।

  • কন্ডোম বা সুরক্ষা পদ্ধতি ব্যবহার না করা।

৩. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস
  • এইচআইভি (HIV) আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকে, ফলে তারা HPV এবং অন্যান্য সংক্রমণের প্রভাবে দ্রুত কোষগত ক্ষতির শিকার হতে পারেন।

  • অঙ্গ প্রতিস্থাপনের পর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দমনে ব্যবহৃত ওষুধও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৪. দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা ক্ষত
  • অ্যানাল ফিশার, ফিস্টুলা বা দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহ অ্যানাল অঞ্চলের টিস্যুতে পরিবর্তন আনতে পারে।

  • ক্রোনস ডিজিজ বা আলসারেটিভ কোলাইটিসের মতো প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

৫. ধূমপান
  • ধূমপান বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়, যার মধ্যে অ্যানাল ক্যান্সারও রয়েছে।

  • তামাকের ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যান্সার সৃষ্টির প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।

৬. বয়স ও লিঙ্গ
  • সাধারণত ৫০ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি।

  • নারীদের মধ্যে এর হার তুলনামূলক বেশি, বিশেষ করে যাদের HPV সংক্রমণের ইতিহাস আছে।

৭. অন্যান্য কারণ
  • যৌনাঙ্গ বা অ্যানাল অঞ্চলে ওয়ার্টস (Genital warts) থাকা।

  • HPV টিকাদান না করা।

  • পূর্বে সার্ভিকাল, ভ্যাজাইনাল বা ভলভা ক্যান্সার হওয়া।

অ্যানাল ক্যান্সারের ধরণ:

অ্যানাল ক্যান্সার প্রধানত দুই ধরনের হতে পারে —

১. স্কোয়ামাস সেল কারসিনোমা (Squamous Cell Carcinoma)
  • এটি অ্যানাল ক্যান্সারের সবচেয়ে সাধারণ ধরন, প্রায় ৮০-৯০% ক্ষেত্রে দেখা যায়।

  • মলদ্বারের ভেতরের আস্তরণে থাকা স্কোয়ামাস কোষ থেকে উৎপত্তি হয়।

  • HPV সংক্রমণ, বিশেষত HPV টাইপ ১৬ ও ১৮, এ ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেক বাড়ায়।

২. এডেনোকারসিনোমা (Adenocarcinoma)
  • মলদ্বারের গ্রন্থি বা গ্ল্যান্ড থেকে উৎপত্তি হয়।

  • এটি তুলনামূলকভাবে বিরল, কিন্তু প্রগতি হলে মলাশয়ের (Rectum) ক্যান্সারের মতো আচরণ করতে পারে।

  • দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ, গ্রন্থিজনিত পরিবর্তন ইত্যাদি কারণ থাকতে পারে।

৩. বেসাল সেল কারসিনোমা (Basal Cell Carcinoma)
  • ত্বকের বেসাল কোষ থেকে তৈরি হয়।

  • মলদ্বারের চারপাশের ত্বকে এ ধরনের ক্যান্সার দেখা দিতে পারে।

  • তুলনামূলকভাবে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং খুব কমই শরীরের অন্য অংশে ছড়ায়।

৪. মেলানোমা (Melanoma of the Anus)
  • মলদ্বারের ত্বক বা মিউকোসায় থাকা রঞ্জক উৎপাদনকারী মেলানোসাইট কোষ থেকে উৎপত্তি হয়।

  • অত্যন্ত বিরল কিন্তু আগ্রাসী প্রকৃতির ক্যান্সার।

  • সাধারণত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং চিকিৎসা কঠিন হয়।

৫. সারকোমা (Sarcoma)
    • মলদ্বারের চারপাশের সংযোজক টিস্যু, পেশি বা রক্তনালী থেকে উৎপত্তি হতে পারে।

    • অত্যন্ত বিরল, তবে কিছু ক্ষেত্রে আক্রমণাত্মক হতে পারে।

অ্যানাল ক্যান্সারের প্রাথমিক উপসর্গ:

প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যানাল ক্যান্সার শনাক্ত করা কঠিন, কারণ উপসর্গগুলো অনেক সময় হালকা বা অন্য রোগের মতো মনে হয়। তবে সচেতন থাকলে প্রাথমিক পর্যায়েই লক্ষণগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব।

১. মলদ্বার থেকে রক্তপাত
  • এটি সবচেয়ে সাধারণ প্রাথমিক লক্ষণ।

  • রক্তপাত হালকা (টিস্যুতে দাগ) বা বেশি হতে পারে।

  • অনেক সময় রোগী ভেবে নেন এটি শুধুই পাইলসের কারণে হচ্ছে।

২. অ্যানাল অঞ্চলে ব্যথা বা অস্বস্তি
  • মলত্যাগের সময় বা বসার সময় ব্যথা হতে পারে।

  • কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী হালকা জ্বালাপোড়া অনুভূত হয়।

৩. অ্যানালের চারপাশে গুটি বা ফোলাভাব
  • ছোট টিউমার বা শক্ত গুটি অনুভূত হতে পারে।

  • এটি ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।

৪. চুলকানি বা জ্বালাপোড়া অনুভূতি
  • মলদ্বারের চারপাশে ত্বকের পরিবর্তনের কারণে হতে পারে।

  • প্রায়ই এটি এক ধরনের স্থায়ী অস্বস্তি তৈরি করে।

৫. অ্যানাল সংকোচন বা মলত্যাগে অসুবিধা
  • টিউমার বড় হলে অ্যানাল খোলার জায়গা সংকুচিত হতে পারে।

  • মলত্যাগের সময় চাপ অনুভূত হয় বা মল পাতলা/ফিতার মতো হয়ে যায়।

৬. অস্বাভাবিক স্রাব (discharge)
  • কিছু ক্ষেত্রে মিউকাস বা পুঁজের মতো স্রাব হতে পারে।

প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ পদ্ধতি:

অ্যানাল ক্যান্সার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে হলে নিয়মিত পরীক্ষা ও সচেতনতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

১. রোগের ইতিহাস ও শারীরিক পরীক্ষা
  • চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, যৌন ইতিহাস, HPV বা HIV সংক্রমণের ইতিহাস, ধূমপানের অভ্যাস ইত্যাদি জানতে চান।

  • অ্যানাল ও চারপাশের ত্বক ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়, গুটি, ক্ষত বা অস্বাভাবিক রঙের পরিবর্তন আছে কিনা দেখা হয়।

২. ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশন (DRE)
  • চিকিৎসক হাতের আঙুলে গ্লাভস ও লুব্রিকেন্ট ব্যবহার করে মলদ্বারের ভেতর স্পর্শ করেন।

  • এতে টিউমার, শক্ত গুটি, বা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অনুভব করা যায়।

৩. অ্যানোস্কপি (Anoscopy)
  • একটি ছোট নল (anoscope) ব্যবহার করে মলদ্বারের ভেতরের অংশ সরাসরি দেখা হয়।

  • এটি ছোট ক্ষত, আলসার বা টিউমার চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।

৪. প্রোক্টোস্কপি বা সিগময়েডোস্কপি
  • অ্যানাল ক্যান্সারের সন্দেহ হলে প্রোক্টোস্কপি বা ফ্লেক্সিবল সিগময়েডোস্কপি করা হয়, যাতে মলদ্বার থেকে মলাশয়ের উপরের অংশ পর্যন্ত দেখা যায়।

  • একই সঙ্গে টিস্যুর নমুনা সংগ্রহ করা যায়।

৫. বায়োপসি (Biopsy)
  • নিশ্চিত নির্ণয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

  • সন্দেহজনক টিস্যুর ছোট একটি অংশ কেটে মাইক্রোস্কোপে পরীক্ষা করা হয়।

  • বায়োপসি রিপোর্টে ক্যান্সারের ধরন ও গ্রেড নির্ধারণ হয়।

৬. ইমেজিং পরীক্ষা (প্রয়োজনে)

প্রাথমিক অবস্থায় ছড়িয়ে পড়া আছে কিনা দেখতে ব্যবহার হয়—

  • MRI: টিউমারের গভীরতা ও পার্শ্ববর্তী টিস্যুর অবস্থা বোঝার জন্য।

  • CT স্ক্যান: অন্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়া আছে কিনা দেখতে।

  • PET স্ক্যান: সক্রিয় ক্যান্সার কোষ শনাক্তে সহায়ক।

৭. HPV টেস্টিং (প্রয়োজনে)
  • যেহেতু HPV সংক্রমণ অ্যানাল ক্যান্সারের বড় কারণ, তাই কিছু ক্ষেত্রে টিস্যুতে HPV পরীক্ষা করা হয়।

প্রতিরোধের উপায়:

যদিও সবসময় প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে কিছু পদক্ষেপে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়।

১. HPV সংক্রমণ প্রতিরোধ
  • HPV ভ্যাকসিন গ্রহণ: গার্ডাসিল বা সার্ভারিক্সের মতো ভ্যাকসিন HPV টাইপ ১৬, ১৮ সহ উচ্চ ঝুঁকির ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে কার্যকর।

  • ভ্যাকসিন ideally যৌন সম্পর্ক শুরু হওয়ার আগে (৯–২৬ বছর বয়সে) নেওয়া সবচেয়ে উপকারী।

  • প্রয়োজনে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও ভ্যাকসিন দেওয়া যেতে পারে, তবে কার্যকারিতা কম হতে পারে।

২. সুরক্ষিত যৌন আচরণ
  • কন্ডোম ব্যবহার করলে HPV, HIV ও অন্যান্য যৌন সংক্রমিত রোগের ঝুঁকি কমে।

  • একাধিক যৌন সঙ্গী পরিহার করা এবং পার্টনারের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি জানা।

৩. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা শক্ত রাখা
  • HIV সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা (অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি নিয়মিত গ্রহণ)।

  • স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত ব্যায়াম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

৪. ধূমপান ত্যাগ
  • তামাকের ক্ষতিকারক উপাদান কোষের DNA ক্ষতিগ্রস্ত করে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।

  • ধূমপান ছেড়ে দিলে শুধু অ্যানাল ক্যান্সার নয়, আরও অনেক ধরনের ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে।

৫. দীর্ঘস্থায়ী অ্যানাল রোগের চিকিৎসা
  • অ্যানাল ফিশার, ফিস্টুলা বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ দ্রুত চিকিৎসা করানো।

  • অস্বাভাবিক রক্তপাত বা ব্যথা হলে অবহেলা না করা।

৬. নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণদের জন্য)
  • HIV আক্রান্ত ব্যক্তি, একাধিক যৌন সঙ্গী থাকা ব্যক্তি, বা পূর্বে HPV সংক্রমিত ব্যক্তিদের নিয়মিত অ্যানোস্কপি বা পাপ টেস্ট (anal Pap test) করানো।

  • প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হলে চিকিৎসা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

৭. ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা
    • যৌনাঙ্গ ও অ্যানাল অঞ্চলের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা।

    • সংক্রমণ হলে দ্রুত চিকিৎসা করানো।

চিকিৎসা ব্যবস্থা:

চিকিৎসা নির্ভর করে ক্যান্সারের ধাপ, টিউমারের আকার ও রোগীর স্বাস্থ্যের উপর।

১. কেমোরেডিওথেরাপি
  • এটি অ্যানাল ক্যান্সারের স্ট্যান্ডার্ড প্রাথমিক চিকিৎসা।

  • কেমোথেরাপি (যেমন 5-FU ও Mitomycin C) ও রেডিওথেরাপি একসাথে দেওয়া হয়।

  • লক্ষ্য: টিউমার ধ্বংস করা, অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন কমানো এবং মলদ্বারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বজায় রাখা।

  • চিকিৎসা সাধারণত ৫-৬ সপ্তাহ চলে।

  • অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এটি সম্পূর্ণভাবে ক্যান্সার নিরাময় করতে পারে।

২. অস্ত্রোপচার 

সাধারণত তখনই করা হয় যখন—

  • কেমোরেডিওথেরাপি সফল হয়নি।

  • টিউমার পুনরায় ফিরে এসেছে।

ধরন

  • Abdominoperineal Resection (APR): মলদ্বার, মলাশয় এবং পার্শ্ববর্তী টিস্যু সরিয়ে দেওয়া হয় এবং রোগীকে স্থায়ী কলোস্টোমি (পেটে স্থায়ী মলনালি) ব্যবহার করতে হয়।

  • ছোট, খুব প্রাথমিক স্তরের টিউমার হলে Local excision করা যেতে পারে।

৩. রেডিওথেরাপি এককভাবে
  • খুব প্রাথমিক স্টেজে বা অস্ত্রোপচারের অযোগ্য রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ হতে পারে।

  • ব্যথা ও রক্তপাত কমাতে প্যালিয়েটিভ হিসেবেও ব্যবহার হয়।

৪. কেমোথেরাপি এককভাবে
  • সাধারণত রেডিওথেরাপির সাথে ব্যবহার হয়, তবে দূরবর্তী মেটাস্টেসিস থাকলে এককভাবে দেওয়া হয়।

  • মূলত রোগ নিয়ন্ত্রণ ও উপসর্গ কমানোর জন্য।

৫. প্যালিয়েটিভ কেয়ার
  • শেষ পর্যায়ের রোগীদের জন্য ব্যথা নিয়ন্ত্রণ, রক্তপাত বন্ধ করা, পুষ্টি বজায় রাখা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা।

৬. ফলো-আপ ও পুনর্মূল্যায়ন
  • চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর প্রথম ২-৩ বছর প্রতি ৩-৬ মাস অন্তর চেকআপ।

  • ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামিনেশন, অ্যানোস্কপি, ইমেজিং টেস্ট করা হয়।

  • দ্রুত শনাক্ত হলে পুনরাবৃত্ত ক্যান্সার চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তের গুরুত্ব:

১. চিকিৎসায় সফলতার হার বেশি
  • প্রাথমিক পর্যায়ে টিউমার ছোট ও সীমিত এলাকায় থাকে, আশেপাশের লিম্ফ নোড বা দূরবর্তী অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েনি।

  • এই অবস্থায় কেমোরেডিওথেরাপি দিয়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব হয়।

  • সফলতার হার প্রায় ৮০% বা তারও বেশি হতে পারে।

২. জটিল চিকিৎসা এড়ানো যায়
  • বড় অপারেশন বা স্থায়ী কলোস্টোমি লাগানোর মতো পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।

  • রোগীর স্বাভাবিক মলদ্বার ও মলত্যাগের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখা যায়।

৩. চিকিৎসার খরচ ও সময় কম
  • প্রাথমিক চিকিৎসা তুলনামূলকভাবে কম সময়সাপেক্ষ এবং খরচও কম হয়।

  • উন্নত পর্যায়ের চিকিৎসা (অস্ত্রোপচার, দীর্ঘমেয়াদি কেমোথেরাপি, প্যালিয়েটিভ কেয়ার) অনেক বেশি ব্যয়বহুল।

৪. রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কম
  • টিউমার ছোট থাকায় শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা কম থাকে।

  • ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।

৫. জীবনমান ভালো থাকে
  • প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা নিলে ব্যথা, রক্তপাত, সংকোচন ইত্যাদি জটিল উপসর্গ তেমন হয় না।

  • রোগীর শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক জীবন তুলনামূলক স্বাভাবিক থাকে।

৬. বেঁচে থাকার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি
  • পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত রোগীদের ৫ বছর বা তার বেশি বেঁচে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

  • উন্নত পর্যায়ে শনাক্ত হলে এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

অ্যানাল ক্যান্সার একটি বিরল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ রোগ, যা সচেতনতা ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের মাধ্যমে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। HPV সংক্রমণ প্রতিরোধ, নিরাপদ যৌন আচরণ, ধূমপান ত্যাগ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা—এই চারটি বিষয় মেনে চললে ঝুঁকি অনেক কমানো যায়। আর কোনো অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….

অ্যানাল ক্যান্সার: কীভাবে হয় এবং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করবেন (FAQ)

প্রশ্ন ১: অ্যানাল ক্যান্সার কী?

উত্তর: অ্যানাল ক্যান্সার হলো মলদ্বারের কোষে অস্বাভাবিক ও নিয়ন্ত্রণহীন বৃদ্ধির ফলে তৈরি হওয়া টিউমার। এটি মলদ্বারের ভেতর বা ত্বকে হতে পারে এবং ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়।

প্রশ্ন ২: অ্যানাল ক্যান্সার কীভাবে হয়?

উত্তর: প্রধানত হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (HPV) সংক্রমণের কারণে। দীর্ঘমেয়াদী HPV সংক্রমণ কোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটায়, যা ক্যান্সার তৈরি করে। এছাড়া ধূমপান, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া, অ্যানাল যৌনসম্পর্ক, এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহও এর কারণ হতে পারে।

প্রশ্ন ৩: প্রাথমিক পর্যায়ে অ্যানাল ক্যান্সারের উপসর্গ কী কী?

উত্তর:

  • মলদ্বার থেকে হালকা বা নিয়মিত রক্তপাত

  • অ্যানাল অঞ্চলে ব্যথা বা অস্বস্তি

  • ছোট গুটি বা ফোলাভাব অনুভব হওয়া

  • মলত্যাগে সমস্যা বা সংকোচন

  • অস্বাভাবিক স্রাব বা চুলকানি

প্রশ্ন ৪: প্রাথমিক পর্যায়ে কিভাবে শনাক্ত করবেন?

উত্তর:

  • নিয়মিত ডিজিটাল রেক্টাল পরীক্ষা (DRE) করতে হবে।

  • অ্যানোস্কপি দ্বারা মলদ্বারের ভেতরের অংশ দেখা।

  • সন্দেহজনক ক্ষেত্রে টিস্যুর নমুনা (বায়োপসি) নেওয়া।

  • ঝুঁকিপূর্ণদের নিয়মিত স্ক্রিনিং করানো।

প্রশ্ন ৫: কারা বেশি ঝুঁকিতে?

উত্তর:

  • যারা HPV সংক্রমিত বা অ্যানাল যৌনসম্পর্কে লিপ্ত।

  • HIV আক্রান্ত বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া ব্যক্তি।

  • ধূমপায়ী এবং বহু সংখ্যক যৌন সঙ্গী থাকা।

  • পূর্বে সার্ভিক্যাল বা অন্যান্য জৈবিক ক্যান্সার আক্রান্ত।

প্রশ্ন ৬: অ্যানাল ক্যান্সার প্রতিরোধে কী করা যেতে পারে?

উত্তর:

  • HPV টিকা নেওয়া।

  • সুরক্ষিত যৌন সম্পর্ক বজায় রাখা।

  • ধূমপান পরিহার করা।

  • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা।

  • দীর্ঘস্থায়ী অ্যানাল সমস্যার দ্রুত চিকিৎসা।

প্রশ্ন ৭: অ্যানাল ক্যান্সার প্রাথমিক অবস্থায় ধরা গেলে চিকিৎসা কেমন?

উত্তর: অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেমোরেডিওথেরাপি দিয়ে নিরাময় সম্ভব। এটি টিউমার ধ্বংস করে এবং মলদ্বারের কার্যক্ষমতা বজায় রাখে। প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার করা হয়।