গর্ভাবস্থা একটি নারীর জীবনের অন্যতম সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে মায়ের শরীরে নানা ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যা শুধু তার নিজের স্বাস্থ্যের ওপর নয়, শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের উপরও প্রভাব ফেলে। এর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা হলো গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus – GDM)।গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে গর্ভাবস্থার সময় মায়ের শরীরে রক্তে গ্লুকোজ বা শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক সীমার বাইরে বেড়ে যায়। অনেক সময় গর্ভবতী মায়েরা এই সমস্যাকে গুরুত্ব না দিলেও, বাস্তবে এটি মা ও শিশুর জন্য একাধিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কী:
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলো ডায়াবেটিসের একটি ধরন যা গর্ভাবস্থার সময় দেখা দেয় এবং সাধারণত সন্তান জন্মের পর এটি কমে যায়। তবে, যেসব মায়েদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হয়, ভবিষ্যতে তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে।
কেন হয়:
গর্ভাবস্থায় প্ল্যাসেন্টা হরমোন উৎপাদন করে, যা শিশুর বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। কিন্তু এই হরমোনগুলো ইনসুলিনের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এর ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায় এবং তখনই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দেয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকির কারণ:
১. শারীরিক ও পারিবারিক কারণ
-
স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন (Obesity):
যেসব নারীর গর্ভাবস্থার আগে থেকেই অতিরিক্ত ওজন রয়েছে, বিশেষত BMI ≥ ২৫ বা ৩০, তাদের ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেশি থাকে। ফলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেক বাড়ে। -
পারিবারিক ইতিহাস (Family History):
পরিবারের কারও টাইপ-২ ডায়াবেটিস থাকলে বা মায়ের নিজস্ব ডায়াবেটিস ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। -
আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার ইতিহাস:
পূর্ববর্তী গর্ভধারণে যদি GDM ধরা পড়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় আবার হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
২. মাতৃ-সংক্রান্ত কারণ
-
বয়স (Maternal Age):
সাধারণত ২৫ বছরের পর থেকে ঝুঁকি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। বিশেষত ৩৫ বছরের বেশি বয়সী মায়েদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। -
জাতিগত ও ভৌগোলিক কারণ:
এশীয় (বাংলাদেশি, ভারতীয়, পাকিস্তানি), আফ্রিকান, হিস্পানিক এবং নেটিভ আমেরিকান নারীদের মধ্যে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি। -
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS):
যেসব নারীর PCOS আছে, তাদের শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সাধারণত বেশি থাকে, ফলে GDM হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। -
মেটাবলিক সিনড্রোম বা হাইপারটেনশন:
রক্তচাপ বেশি, কোলেস্টেরল অস্বাভাবিক, অথবা অন্যান্য মেটাবলিক সমস্যা থাকলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
৩. পূর্ববর্তী গর্ভধারণ ও প্রসব-সংক্রান্ত কারণ
-
অতীতের জটিল গর্ভধারণ:
পূর্বে যদি মৃত সন্তান প্রসব (stillbirth), অকারণে গর্ভপাত, বা অস্বাভাবিক নবজাতক জন্মের ইতিহাস থাকে, তবে ঝুঁকি বেশি। -
বড় ওজনের শিশুর জন্ম (Macrosomia):
আগের গর্ভধারণে যদি ৪ কেজি বা তার বেশি ওজনের শিশু জন্ম হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। -
অ্যামনিওটিক ফ্লুইড বেশি থাকা (Polyhydramnios):
আগের গর্ভধারণে বা বর্তমান গর্ভাবস্থায় যদি অস্বাভাবিকভাবে বেশি অ্যামনিওটিক ফ্লুইড পাওয়া যায়, তা গোপনে থাকা ডায়াবেটিস বা GDM-এর ইঙ্গিত হতে পারে।
৪. জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাস
-
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা (Physical Inactivity):
যারা নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রম করেন না, তাদের শরীরে ইনসুলিন কার্যকারিতা কম থাকে। -
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস:
অতিরিক্ত চর্বি, ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয় এবং উচ্চ ক্যালোরি গ্রহণ ঝুঁকি বাড়ায়। -
ধূমপান ও অ্যালকোহল:
এ ধরনের অভ্যাস মেটাবলিক সমস্যা ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়াতে পারে।
৫. অন্যান্য কারণ
-
ওষুধজনিত কারণ:
যেমন – কিছু স্টেরয়েড ওষুধ, অ্যান্টিসাইকোটিক ড্রাগ, বা অন্যান্য হরমোনাল ওষুধ গর্ভাবস্থায় ব্যবহার করলে ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। -
একাধিক সন্তান ধারণ (Multiple Pregnancy):
যমজ বা ত্রৈমাসিক সন্তান থাকলে হরমোনাল চাপ বেশি হয়, ফলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বেড়ে যায়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের লক্ষণ:
-
অতিরিক্ত তৃষ্ণা (Excessive Thirst):
শরীরে অতিরিক্ত গ্লুকোজ জমে গেলে তা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। ফলে পানিশূন্যতা হয় এবং সারাক্ষণ তৃষ্ণা লাগে। -
বারবার প্রস্রাব হওয়া (Frequent Urination):
রক্তে শর্করা বেশি থাকলে কিডনি বাড়তি গ্লুকোজ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করার চেষ্টা করে, যার ফলে ঘন ঘন প্রস্রাব হয়। -
অতিরিক্ত ক্ষুধা বা হঠাৎ ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া (Increased Hunger):
শরীর পর্যাপ্ত ইনসুলিন ব্যবহার করতে না পারলে গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করে শক্তি তৈরি করতে পারে না। ফলে শরীর বারবার শক্তির ঘাটতি অনুভব করে এবং ক্ষুধা বেড়ে যায়। -
অস্বাভাবিক ক্লান্তি (Unusual Fatigue):
শরীর শক্তি পায় না, ফলে অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা ও অবসন্নতা দেখা দিতে পারে। -
দৃষ্টি ঝাপসা হওয়া (Blurred Vision):
রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লে চোখের লেন্স ফুলে যায় বা অস্বাভাবিকভাবে কাজ করে, ফলে ঝাপসা দেখা দেয়। -
সংক্রমণ সহজে হওয়া (Frequent Infections):
-
প্রস্রাবের সংক্রমণ (Urinary Tract Infection – UTI)
-
ত্বকের সংক্রমণ
-
যোনির ছত্রাক সংক্রমণ (Yeast infection)
এগুলো বারবার দেখা দিতে পারে।
-
-
শিশুর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি:
অনেক সময় গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের সরাসরি লক্ষণ না থাকলেও আল্ট্রাসাউন্ডে শিশুর স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত বৃদ্ধি (Macrosomia) দেখা গেলে সন্দেহ করা হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের প্রভাব:
১. মায়ের উপর প্রভাব
ক) গর্ভাবস্থায়
-
উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়া (Preeclampsia):
রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া ও প্রোটিনিউরিয়া হতে পারে, যা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। -
সিজারিয়ান প্রসবের ঝুঁকি বৃদ্ধি:
শিশুর অতিরিক্ত ওজন (Macrosomia) থাকার কারণে স্বাভাবিক প্রসব কঠিন হয়ে যায়। -
অতিরিক্ত অ্যামনিওটিক ফ্লুইড (Polyhydramnios):
অনেক সময় গর্ভে শিশুর চারপাশে তরল বেশি জমে যায়, যা প্রি-টার্ম লেবার, প্রল্যাপসড কর্ড বা প্রসবকালে জটিলতা তৈরি করতে পারে। -
সংক্রমণ প্রবণতা:
প্রস্রাবের সংক্রমণ (UTI), ত্বকের সংক্রমণ, বা যোনি সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
খ) প্রসবের পর
-
টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি:
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হওয়া নারীদের ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা ৩০–৫০% পর্যন্ত বেড়ে যায়। -
পুনরায় GDM হওয়া:
একবার গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় পুনরায় তা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
২. শিশুর উপর প্রভাব
ক) গর্ভাবস্থায়
-
Macrosomia (অতিরিক্ত বড় শিশু):
রক্তে বেশি গ্লুকোজ প্লাসেন্টার মাধ্যমে ভ্রূণের কাছে যায়। এতে শিশুর শরীরে অতিরিক্ত ইনসুলিন উৎপাদিত হয়, ফলে ওজন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
ফলাফল: প্রসবকালে কাঁধ আটকে যাওয়া (Shoulder dystocia), জন্ম আঘাত ইত্যাদি। -
Congenital anomalies (যদি গর্ভাবস্থার শুরুতে অনিয়ন্ত্রিত থাকে):
যদিও GDM সাধারণত মাঝামাঝি সময়ে দেখা দেয়, তবে খুব আগে থেকেই রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শিশুর হার্ট, নিউরাল টিউব বা অন্যান্য জন্মগত ত্রুটি হতে পারে।
খ) জন্মের পর
-
নবজাতকের হাইপোগ্লাইসেমিয়া (কম রক্তশর্করা):
মায়ের উচ্চ গ্লুকোজের কারণে শিশুর শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যায়। জন্মের পর হঠাৎ মায়ের গ্লুকোজ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে শিশুর রক্তে শর্করা দ্রুত নেমে যায়। -
শ্বাসকষ্ট (Respiratory Distress Syndrome):
ফুসফুসের পরিপূর্ণ বিকাশে দেরি হয়, ফলে শিশুর শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। -
জন্ডিস (Neonatal Jaundice):
জন্মের পর শিশুর রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে গিয়ে জন্ডিস হতে পারে। -
মৃত সন্তান প্রসব (Stillbirth) বা আকস্মিক মৃত্যু:
নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিসে গর্ভকালীন শেষ সময়ে এ ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়।
গ) দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
-
স্থূলতা ও মেটাবলিক সিনড্রোম:
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মায়ের সন্তানদের বড় হয়ে স্থূলতা, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও মেটাবলিক সিনড্রোম হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। -
টাইপ-২ ডায়াবেটিস:
ভবিষ্যতে এ ধরনের সন্তানের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকিও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নির্ণয়:
১. প্রাথমিক ঝুঁকি মূল্যায়ন
-
প্রথমবার প্রেগন্যান্সি চেকআপের সময় মায়ের ঝুঁকি যাচাই করা হয় (স্থূলতা, বয়স বেশি, পারিবারিক ইতিহাস ইত্যাদি)।
-
যদি উচ্চ ঝুঁকি থাকে, তবে গর্ভধারণের শুরুর দিকেই টেস্ট করা হয়।
২. স্ক্রিনিং টেস্ট (২৪–২৮ সপ্তাহে করা হয়)
ক) গ্লুকোজ চ্যালেঞ্জ টেস্ট
-
খালি পেটে থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
-
৫০ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ানো হয়।
-
১ ঘণ্টা পর রক্তে শর্করা মাপা হয়।
৩. ডায়াগনস্টিক টেস্ট
ক) ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট
WHO ও ADA (American Diabetes Association) অনুযায়ী প্রচলিত পদ্ধতি
-
টেস্টের আগে মায়ের অন্তত ৮ ঘণ্টা উপবাস থাকতে হবে।
-
প্রথমে খালি পেটে রক্তে শর্করা মাপা হয়।
-
এরপর ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ পানি মিশিয়ে খাওয়ানো হয়।
-
১ ঘণ্টা ও ২ ঘণ্টা পর রক্তে শর্করা মাপা হয়।
খ) ওরাল গ্লুকোজ টলারেন্স টেস্ট
বিশেষ করে আমেরিকায় (Carpenter-Coustan criteria) ব্যবহৃত
-
খালি পেটে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
-
এরপর 100 গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ানো হয়।
-
১ ঘণ্টা, ২ ঘণ্টা ও ৩ ঘণ্টা পর রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
-
অন্তত ২টি মান বেশি হলে GDM ধরা হয়।
৪. বিকল্প সহজ পদ্ধতি (বিশেষ করে ভারত ও বাংলাদেশে ব্যবহৃত)
-
খালি পেটে হোক বা না হোক, গর্ভবতী মহিলাকে ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ানো হয়।
-
২ ঘণ্টা পর রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা হয়।
-
যদি ≥ 7.8 mmol/L (140 mg/dl) হয় → GDM ধরা হয়।
এটি সহজ ও বাস্তবসম্মত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় বেশি ব্যবহৃত হয়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ:
১. জীবনধারা পরিবর্তন
ক) খাদ্য নিয়ন্ত্রণ
-
সুষম খাদ্য: শর্করা, প্রোটিন ও চর্বির ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
-
বারবার অল্প করে খাওয়া: দিনে ৫–৬ বার ছোট খাবার খাওয়া ভালো, যাতে রক্তে শর্করা হঠাৎ না বাড়ে।
-
জটিল কার্বোহাইড্রেট: ভাতের বদলে লাল চাল/আটা, ডাল, শাকসবজি, ফলমূল (যথোপযুক্ত পরিমাণে)।
-
চিনি ও মিষ্টি পরিহার: কোমল পানীয়, মিষ্টি, ফাস্টফুড, ভাজাপোড়া এড়িয়ে চলতে হবে।
-
ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ:
-
স্বাভাবিক ওজন হলে: প্রতি কেজি ওজনের জন্য ~৩০ ক্যালোরি
-
অতিরিক্ত ওজন হলে: ২৪–২৫ ক্যালোরি
-
স্থূল হলে: ২০–২২ ক্যালোরি
-
খ) শারীরিক কার্যকলাপ
-
প্রতিদিন হালকা থেকে মাঝারি ব্যায়াম (যেমন—হাঁটা, হালকা যোগব্যায়াম, প্রেগন্যান্সি এক্সারসাইজ) নিরাপদে করা উচিত।
-
দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা (২–৩ ভাগে ভাগ করে হাঁটা ভালো)।
-
তবে ডাক্তার অনুমোদন ছাড়া অতিরিক্ত কষ্টকর বা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যায়াম নয়।
২. রক্তে শর্করা মনিটরিং
-
মায়ের Fasting ও Postprandial (খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর) রক্তে শর্করা নিয়মিত মাপতে হবে।
-
লক্ষ্য মাত্রা (ADA অনুযায়ী):
-
Fasting: ≤ 5.3 mmol/L (95 mg/dl)
-
১ ঘণ্টা পর: ≤ 7.8 mmol/L (140 mg/dl)
-
২ ঘণ্টা পর: ≤ 6.7 mmol/L (120 mg/dl)
-
৩. ওষুধের চিকিৎসা
ক) ইনসুলিন থেরাপি
-
যদি খাদ্য ও ব্যায়ামেও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে না আসে, তখন ইনসুলিন দেওয়া হয়।
-
ইনসুলিন গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে সবচেয়ে নিরাপদ, কারণ এটি প্লাসেন্টা অতিক্রম করে না।
-
ডোজ নির্ধারণ করেন চিকিৎসক, রক্তে শর্করার মাত্রা ও ওজন অনুযায়ী।
খ) মুখে খাওয়ার ওষুধ
-
কিছু ক্ষেত্রে Metformin বা Glyburide ব্যবহার করা যায়, তবে অনেক গাইডলাইনে এগুলো ইনসুলিনের বিকল্প নয়, কেবল নির্দিষ্ট রোগীর জন্য অনুমোদিত।
৪. গর্ভকালীন সময়ে বিশেষ যত্ন
-
নিয়মিত আল্ট্রাসাউন্ড করে শিশুর বৃদ্ধি ও অ্যামনিওটিক ফ্লুইড পর্যবেক্ষণ।
-
প্রসবের সময় শিশুর ওজন, মায়ের অবস্থা বিবেচনা করে সিজারিয়ান বা স্বাভাবিক প্রসবের সিদ্ধান্ত নেওয়া।
-
প্রয়োজনে প্রসব ৩৮–৪০ সপ্তাহে ইন্ডিউস করা হতে পারে।
৫. প্রসবের পর নিয়ন্ত্রণ
-
সাধারণত প্রসবের পর গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সেরে যায়।
-
তবে মা ও শিশুর উভয়ের ভবিষ্যতে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি থাকে।
-
তাই:
-
প্রসবের ৬ সপ্তাহ পর পুনরায় OGTT করা উচিত।
-
মা যেন স্বাস্থ্যকর খাদ্য ও ব্যায়াম চালিয়ে যান।
-
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ:
যদিও এটি সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা যায় না, তবে কিছু পদক্ষেপ ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারে।
-
সুস্থ জীবনযাপন – গর্ভধারণের আগে থেকেই সঠিক ওজন বজায় রাখা জরুরি।
-
সুষম খাদ্যাভ্যাস – নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া।
-
নিয়মিত ব্যায়াম – প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হেঁটে শরীর সচল রাখা।
-
গর্ভধারণের আগে চেকআপ – যাদের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তারা আগে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা:
-
“ডায়াবেটিস মানেই সবকিছু খাওয়া বন্ধ।”
আসলে চিকিৎসকের নির্দেশনা মেনে সুষম খাদ্য খাওয়া জরুরি, সব খাবার বন্ধ নয়। -
“শুধু ইনসুলিন নিলেই হবে।”
ইনসুলিনের পাশাপাশি খাদ্য ও জীবনযাপনের পরিবর্তনও প্রয়োজন। -
“শিশুর কোনো সমস্যা হবে না।”
নিয়ন্ত্রণে না থাকলে শিশুর জন্য বড় জটিলতা হতে পারে।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্য সমস্যা, যা উপেক্ষা করলে মা ও শিশুর জন্য জীবনঘাতী জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে সুসংবাদ হলো—সঠিক সময়ে নির্ণয়, নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যায়াম ও প্রয়োজনে ইনসুলিন গ্রহণের মাধ্যমে এটি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।প্রত্যেক গর্ভবতী মায়ের উচিত গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং ঝুঁকির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। মনে রাখতে হবে, একটি সুস্থ মা-ই একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারে। তাই নিজের যত্ন নেওয়া মানে ভবিষ্যতের প্রজন্মের যত্ন নেওয়া।
……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের প্রভাব: গর্ভবতী মায়েদের যা জানা জরুরি (FAQ)
১. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কী?
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলো গর্ভাবস্থায় প্রথমবার সনাক্ত হওয়া উচ্চ রক্তশর্করা। এটি সাধারণত ২৪–২৮ সপ্তাহের দিকে বেশি ধরা পড়ে।
২. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে কি সব সময় উপসর্গ থাকে?
না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তাই নিয়মিত রক্তশর্করা পরীক্ষা (OGTT) করানো জরুরি।
৩. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মায়ের উপর কী প্রভাব ফেলতে পারে?
-
গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্লাম্পসিয়া
-
প্রসবের সময় সিজারিয়ান ডেলিভারির ঝুঁকি
-
অতিরিক্ত অ্যামনিওটিক ফ্লুইড
-
প্রসবের পর ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি
৪. শিশুর উপর এর প্রভাব কী হতে পারে?
-
গর্ভে থাকাকালে: শিশুর ওজন অস্বাভাবিকভাবে বড় হওয়া (Macrosomia)
-
জন্মের পর:
-
রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যাওয়া (Hypoglycemia)
-
শ্বাসকষ্ট (Respiratory Distress Syndrome)
-
জন্ডিস
-
-
দীর্ঘমেয়াদে: স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি
৫. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কি শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়?
যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তবে মৃত সন্তান প্রসব (stillbirth) বা জন্মের সময় জটিলতার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়। তবে নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলে এ ঝুঁকি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা যায়।
৬. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস কি সবসময় থেকে যায়?
না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রসবের পর এটি সেরে যায়। তবে ভবিষ্যতে মায়ের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই প্রসবের ৬ সপ্তাহ পর আবার রক্তশর্করা পরীক্ষা করা উচিত।
৭. গর্ভকালীন ডায়াবেটিস প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করা যায়?
-
স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণ
-
নিয়মিত হালকা ব্যায়াম (যেমন—হাঁটা)
-
চিনি ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলা
-
নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করা
-
প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে ইনসুলিন গ্রহণ
৮. মা যদি নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাহলে কি শিশুর ঝুঁকি কমে যাবে?
হ্যাঁ । সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, প্রয়োজনে ইনসুলিন ও চিকিৎসকের পরামর্শ মানলে মা ও শিশু দুজনেই সুস্থভাবে থাকতে পারে এবং ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
