আমাদের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোর মধ্যে কিডনি অন্যতম। এই ছোট জোড়া অঙ্গ প্রতিদিন আমাদের শরীরকে টক্সিনমুক্ত রাখতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের অনেক দৈনন্দিন অভ্যাস কিডনির উপর ধীরে ধীরে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে – যা আমরা হয়তো টেরই পাই না যতক্ষণ না তা ভয়ানক রূপ নেয়।এই লেখায় আমরা বিশদভাবে জানবো কীভাবে প্রতিদিনের সাধারণ কিছু ভুল আপনার কিডনি নষ্ট করে দিতে পারে এবং আপনি কীভাবে সচেতন হয়ে নিজের কিডনিকে সুস্থ রাখতে পারেন।
কিডনির প্রধান কাজ কী:
যেকোনো সমস্যার গভীরে যাওয়ার আগে আমাদের জানা দরকার কিডনির কাজ কী। কিডনি মূলত রক্ত ছেঁকে (ফিল্টার করে) শরীরের বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি ইউরিন বা প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়। এছাড়াও কিডনি:
-
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখে
-
ইলেকট্রোলাইট ব্যালেন্স বজায় রাখে
-
হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে
-
রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে সহায়ক হরমোন তৈরি করে
কিন্তু নানা ভুল অভ্যাসের কারণে কিডনির এই গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ব্যাহত হয় এবং একসময় কিডনি বিকল (Kidney Failure) হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস যা ধ্বংস করছে কিডনি:
১. পর্যাপ্ত পানি না পান করা
কেন ক্ষতিকর:
কিডনি সঠিকভাবে কাজ করার জন্য পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন হয়। কম পানি পান করলে বর্জ্য পদার্থ ও টক্সিন শরীরে জমে যেতে পারে, ফলে কিডনিতে পাথর তৈরি হতে পারে এবং কিডনি অকেজো হতে পারে।
লক্ষণসমূহ:
-
গাঢ় রঙের প্রস্রাব
-
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া
-
মাথাব্যথা ও ক্লান্তি
সমাধান:
প্রতিদিন অন্তত ৮–১০ গ্লাস পানি পান করুন (ব্যক্তির ওজন, আবহাওয়া ও শারীরিক কার্যকলাপ অনুযায়ী পরিবর্তন হতে পারে)।
২. অতিরিক্ত লবণ খাওয়া
কেন ক্ষতিকর:
লবণে থাকা সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়ায়। উচ্চ রক্তচাপ কিডনির অন্যতম প্রধান শত্রু। লবণের অতিরিক্ত ব্যবহার কিডনির রক্তনালিগুলোর ক্ষতি করে।
সমাধান:
-
দৈনিক ৫-৬ গ্রাম লবণ (প্রায় ১ চা চামচ) গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকুন
-
প্রক্রিয়াজাত খাবার, চিপস, ফাস্ট ফুড, প্যাকেটজাত স্যুপ, আচার এড়িয়ে চলুন
৩. বেশি প্রোটিন গ্রহণ
কেন ক্ষতিকর:
প্রোটিন বিশেষত প্রাণিজ প্রোটিন (মাংস, ডিম, দুধ) বিপাক হয়ে ইউরিয়া তৈরি করে, যা কিডনির মাধ্যমে বের হয়। অতিরিক্ত প্রোটিন কিডনির ওপর চাপ ফেলে, বিশেষ করে যদি কিডনি আগে থেকেই দুর্বল থাকে।
সমাধান:
প্রয়োজন অনুযায়ী প্রোটিন গ্রহণ করুন। যারা কিডনি রোগে আক্রান্ত, তাদের ডায়েটিশিয়ানের পরামর্শে খাদ্য নির্বাচন করা উচিত।
৪. নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ (Painkillers) সেবন
কেন ক্ষতিকর:
নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস (NSAIDs) যেমন: ibuprofen, diclofenac প্রভৃতি কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সমাধান:
-
ব্যথানাশক ওষুধ প্রয়োজন ছাড়া খাবেন না
-
ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন
৫. ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ
কেন ক্ষতিকর:
-
ধূমপান কিডনির রক্তনালিগুলো সংকুচিত করে এবং কার্যকারিতা কমায়
-
অ্যালকোহল কিডনির ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালেন্সে বিঘ্ন ঘটায় এবং রক্তচাপ বাড়ায়
সমাধান:
এসব অভ্যাস সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা উচিত।
৬. অনিয়মিত ঘুম
কেন ক্ষতিকর:
ঘুমের সময় শরীরের রক্তচাপ ও বিপাকীয় প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়। ঘুমের অভাব দীর্ঘ মেয়াদে কিডনির ফিল্টারিং সিস্টেমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
সমাধান:
প্রতিদিন অন্তত ৭–৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন।
৭. উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ না করা
কেন ক্ষতিকর:
এই দুই রোগ কিডনি বিকলের প্রধান কারণ। কিডনি ধীরে ধীরে নষ্ট হয় এবং কোনো উপসর্গ ছাড়া নীরবে ক্ষয় হতে থাকে।
সমাধান:
-
নিয়মিত রক্তচাপ ও রক্তে চিনির মাত্রা পরীক্ষা করুন
-
ওষুধ নিয়মিত খান এবং চিকিৎসকের পরামর্শে থাকুন
৮. প্রস্রাব আটকে রাখা
কেন ক্ষতিকর:
প্রস্রাব চেপে রাখলে কিডনিতে সংক্রমণ, মূত্রনালিতে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ও পাথরের সম্ভাবনা বাড়ে।
সমাধান:
প্রস্রাবের বেগ পেলেই দ্রুত সাড়া দিন।
৯. পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফল না খাওয়া
কেন ক্ষতিকর:
ফাইবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিনের অভাব কিডনির কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
সমাধান:
প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি ও ফল রাখুন, যেমন: টমেটো, কলা, লালশাক, বিটরুট (ডাক্তারের পরামর্শে, যদি কিডনির সমস্যা থাকে)।
১০. কিডনি চেকআপ না করানো
কেন ক্ষতিকর:
অনেক সময় কিডনি রোগের লক্ষণ ধরা পড়ে না। কিন্তু অভ্যন্তরীণ ক্ষতি চলতেই থাকে। নিয়মিত চেকআপ না করলে রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।
সমাধান:
-
বছরে একবার কিডনি ফাংশন টেস্ট (Creatinine, eGFR, Urine test) করুন, বিশেষ করে যদি আপনি উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন (ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, পারিবারিক ইতিহাস থাকলে)
কীভাবে বুঝবেন আপনার কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে:
১. ক্লান্তি ও দুর্বলতা
কিডনি ঠিকভাবে কাজ না করলে শরীরে টক্সিন ও বর্জ্য পদার্থ জমে যায়। এতে শরীরে শক্তি কমে যেতে পারে, ক্লান্তিভাব ও মাথা ভার লাগতে পারে।
২. প্রস্রাবে পরিবর্তন
কিডনির সমস্যা হলে প্রস্রাবের ধরন ও পরিমাণে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা যায়। যেমন:
-
প্রস্রাবের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
-
গাঢ় রঙের বা ফেনাযুক্ত প্রস্রাব
-
প্রস্রাবে রক্ত বা গন্ধ পাওয়া
-
রাতে বারবার প্রস্রাবের বেগ হওয়া
-
প্রস্রাব করতে জ্বালা বা ব্যথা অনুভব করা
৩. শরীর ফুলে যাওয়া
কিডনি সঠিকভাবে অতিরিক্ত পানি ও লবণ নিষ্কাশন না করতে পারলে শরীরে পানি জমে যায়। এতে:
-
চোখের নিচে ফোলা
-
পায়ের গোড়ালি, পা বা হাত ফুলে যাওয়া
-
মুখমণ্ডল ফোলা
এই লক্ষণগুলো ধীরে ধীরে দেখা দিতে পারে।
4. চুলকানি ও শুষ্ক ত্বক
কিডনি ঠিকভাবে ফসফেট ও অন্যান্য বর্জ্য অপসারণ করতে না পারলে সেগুলো রক্তে জমে ত্বকে চুলকানি বা শুষ্কভাব সৃষ্টি করে। দীর্ঘস্থায়ী চুলকানিও কিডনির সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
5. ক্ষুধামান্দ্য ও বমিভাব
কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হলে শরীরে টক্সিন বেড়ে গিয়ে বমিভাব, খিদে না পাওয়া, এমনকি খাবার দেখে বিরক্তি তৈরি হতে পারে। অনেক সময় স্বাদ পরিবর্তনও হয়।
6. শ্বাসকষ্ট
কিডনি ঠিকভাবে পানি নিঃসরণ না করলে ফুসফুসে পানি জমতে পারে, ফলে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আবার অ্যানিমিয়ার (রক্তশূন্যতা) কারণে শরীরে অক্সিজেনের অভাবেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
7. অনিদ্রা ও মনোযোগের ঘাটতি
রক্তে বিষাক্ত পদার্থের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। এতে ঘুমে ব্যাঘাত, মনোযোগে সমস্যা বা স্মৃতিভ্রংশ দেখা দিতে পারে।
8. রক্তশূন্যতা (অ্যানিমিয়া)
কিডনি ইরিথ্রোপয়েটিন (EPO) নামক একটি হরমোন তৈরি করে, যা লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে সহায়তা করে। কিডনি সমস্যায় এই হরমোনের উৎপাদন কমে গিয়ে রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
9. রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া
উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতির কারণও হতে পারে এবং একইসঙ্গে এটি কিডনি রোগের একটি উপসর্গও। কিডনি নষ্ট হলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
10. মুখে ধাতব স্বাদ ও শ্বাসে দুর্গন্ধ
রক্তে ইউরিয়া বেড়ে গেলে মুখে ধাতব স্বাদ লাগে এবং শ্বাসে ইউরিয়ার গন্ধ আসতে পারে। অনেক সময় এ কারণে রোগী খাবার খেতে চায় না।
কিডনি সুস্থ রাখার সহজ টিপস:
১. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শরীর থেকে বর্জ্য ও টক্সিন বের করতে কিডনির সবচেয়ে বড় সহায়ক হচ্ছে পানি।
টিপস:
-
প্রতিদিন ৮–১০ গ্লাস পানি পান করুন (জলবায়ু ও শারীরিক পরিশ্রম অনুযায়ী)
-
প্রস্রাবের রঙ স্বচ্ছ বা হালকা হলুদ থাকলে বুঝবেন পানি যথেষ্ট পান করছেন
২. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
উচ্চ রক্তচাপ কিডনির ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ।
টিপস:
-
কম লবণ খান
-
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
-
নিয়মিত ব্যায়াম করুন
-
চাপমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন
৩. রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করুন
ডায়াবেটিস থাকলে কিডনিতে ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি।
টিপস:
-
নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজ পরীক্ষা করুন
-
শর্করা কম ও আঁশযুক্ত খাবার খান
-
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিন
৪. ব্যথানাশক ওষুধ এড়িয়ে চলুন
অনেকেই নিয়মিত পেইনকিলার নেন, যা কিডনির জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
টিপস:
-
ব্যথা হলে প্রথমে প্রাকৃতিক উপায় ব্যবহার করুন (গরম সেঁক, বিশ্রাম ইত্যাদি)
-
প্রয়োজন হলে স্বল্পমেয়াদে ও চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ নিন
৫. পরিমিত প্রোটিন গ্রহণ করুন
অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ কিডনির ওপর চাপ ফেলে।
টিপস:
-
প্রতিদিনের প্রোটিন চাহিদা অনুযায়ী খান
-
কিডনি সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে প্রোটিন সীমিত করুন
৬. ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন
এই দুটি অভ্যাস কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয় এবং দ্রুত ক্ষতি করে।
টিপস:
-
ধূমপান ছাড়ার জন্য সহায়ক থেরাপি বা পরামর্শ নিন
-
অ্যালকোহল থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকুন
৭. ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অতিরিক্ত ওজন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
টিপস:
-
সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন
-
দৈনিক ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম করুন
-
চিনি ও তেলযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলুন
৮. নিয়মিত ব্যায়াম করুন
রক্তচাপ, ওজন ও রক্তে চিনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করে।
টিপস:
-
হাঁটা, সাঁতার, সাইক্লিং বা যোগব্যায়াম করতে পারেন
-
প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট সক্রিয় থাকুন
৯. পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নিন
ঘুমের অভাব হরমোন ভারসাম্য নষ্ট করে, যা কিডনির ওপর প্রভাব ফেলে।
টিপস:
-
প্রতিদিন ৭–৮ ঘণ্টা গভীর ঘুম নিশ্চিত করুন
-
ঘুমাতে যাওয়ার আগে মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার কমান
১০. নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা করুন
প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের উপসর্গ দেখা যায় না, তাই পরীক্ষাই একমাত্র উপায়।
টিপস:
-
-
বছরে অন্তত একবার Creatinine ও eGFR টেস্ট করুন
-
যদি ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকে, আরও নিয়মিত পরীক্ষা করুন
-
বিশেষভাবে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময়:
১. প্রস্রাবে সমস্যা হলে
-
বারবার প্রস্রাবের বেগ হয়
-
প্রস্রাবের পরিমাণ খুব কম বা বেশি হয়
-
প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া বা ব্যথা হয়
-
প্রস্রাব ঘন হলুদ, লালচে বা রক্তমিশ্রিত
-
প্রস্রাবে ফেনা বা দুর্গন্ধ হয়
২. শরীরে ফোলা দেখা দিলে
-
চোখের নিচে ফুলে যাওয়া
-
পা, গোড়ালি, হাত বা মুখ ফোলা
-
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফোলাভাব স্পষ্ট হয়
৩. অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করলে
-
হালকা কাজেও খুব ক্লান্ত বোধ করা
-
শরীর ভারী লাগা বা ঘনঘন ঘুমিয়ে পড়ার প্রবণতা
-
কোনো কারণ ছাড়াই শক্তি কমে যাওয়া
৪. ক্ষুধামান্দ্য ও বমি হলে
-
দীর্ঘদিন ধরে খেতে ইচ্ছা না করা
-
অল্প খেলেই পেট ভরে যাওয়া
-
বারবার বমি ভাব বা বমি হওয়া
-
খাবারের স্বাদ পরিবর্তন বা মুখে ধাতব স্বাদ অনুভব
৫. শ্বাসকষ্ট বা বুকে ভার লাগা
-
হাঁটতে গেলে হাপিয়ে যাওয়া
-
বিশ্রামে থাকলেও শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
-
বুক ধড়ফড় বা অস্বস্তি
৬. প্রস্রাব আটকে রাখার অভ্যাস এবং এরপর সমস্যা দেখা দিলে
-
দীর্ঘদিন প্রস্রাব চেপে রাখার অভ্যাসের পর প্রস্রাব করতে সমস্যা হলে
-
মূত্রথলিতে ব্যথা, পেটে চাপ বা জ্বালা অনুভব
৭. ত্বকে অতিরিক্ত চুলকানি ও শুষ্কতা
-
কোনো অ্যালার্জি ছাড়া সারাক্ষণ ত্বকে চুলকানি
-
চামড়া খসখসে হয়ে যাওয়া বা ফাটতে শুরু করা
৮. ঘুমে সমস্যা ও মানসিক স্থিরতা কমে যাওয়া
-
রাতের ঘুম ঠিকমতো না হওয়া
-
মনোযোগ কমে যাওয়া বা বিভ্রান্তি
-
মাথা ভার লাগা, ঝিমুনি ভাব
৯. ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে
-
নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা না করলে
-
এসব রোগ থাকলে, প্রতি ৩–৬ মাসে কিডনি ফাংশন টেস্ট করানো উচিত
-
হঠাৎ করে রক্তচাপ বা ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে
১০. পারিবারিক ইতিহাস থাকলে
-
-
পরিবারের কারও কিডনি রোগ থাকলে আপনি উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন
-
যেকোনো অসুস্থতা বা লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত পরীক্ষা করানো জরুরি
-
জীবনযাপন পরিবর্তনেই হতে পারে কিডনি রক্ষার চাবিকাঠি:
আমরা প্রতিদিন যেসব অভ্যাসকে “স্বাভাবিক” মনে করি — যেমন কম পানি খাওয়া, কাজের ফাঁকে প্রস্রাব চেপে রাখা, বা যন্ত্রণায় পেইনকিলার খেয়ে ফেলা — সেগুলো কিডনির জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হতে পারে। কিডনি নীরব ঘাতকের মতো ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে – আর আমরা টের পাই অনেক দেরিতে।
তাই সময় থাকতেই সচেতন হন। জীবনযাত্রায় কিছু ছোট পরিবর্তন কিডনিকে সুস্থ রাখবে, আপনাকে অনেক জটিলতা থেকে মুক্ত রাখবে।
কিডনি আমাদের শরীরের এক নিঃশব্দ রক্ষাকর্তা — এটি প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার রক্ত ফিল্টার করে আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখে। অথচ আমরা নিজের অজান্তেই আমাদের প্রতিদিনের ভুলে এই অঙ্গটিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছি।
জীবনের ছোট ছোট অভ্যাস, খাদ্যাভ্যাসের সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা হতে পারে কিডনি রক্ষার শক্তিশালী হাতিয়ার।
…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….
প্রতিদিনের ভুলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আপনার কিডনি: জেনে নিন কেন(FAQ)
প্রশ্ন ১: প্রতিদিনের কোন কোন ভুল অভ্যাসে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়?
উত্তর:
সাধারণ কিছু অভ্যাস যেমন–
-
কম পানি পান করা
-
অতিরিক্ত লবণ বা প্রোটিন খাওয়া
-
নিয়মিত পেইনকিলার সেবন
-
প্রস্রাব চেপে রাখা
-
ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণ
-
অনিয়মিত ঘুম
এসব ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা নষ্ট করে।
প্রশ্ন ২: পানি কম খেলে কিডনিতে কী ধরনের সমস্যা হয়?
উত্তর:
কম পানি পান করলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ ও টক্সিন জমে যায়, যা কিডনির ফিল্টারিং সিস্টেমে চাপ ফেলে। এতে কিডনিতে পাথর, ইনফেকশন ও দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
প্রশ্ন ৩: ব্যথানাশক ওষুধ কীভাবে কিডনির ক্ষতি করে?
উত্তর:
নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস (NSAIDs) কিডনির রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দেয়। নিয়মিত এসব ওষুধ সেবনে কিডনির কোষ নষ্ট হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কিডনি বিকল হতে পারে।
প্রশ্ন ৪: প্রস্রাব চেপে রাখলে কী হয়?
উত্তর:
প্রস্রাব চেপে রাখলে মূত্রথলিতে ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে পারে, যা সংক্রমণের মাধ্যমে কিডনিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন এ অভ্যাস কিডনিতে স্থায়ী ক্ষতি করে।
প্রশ্ন ৫: খাবারে অতিরিক্ত লবণ কীভাবে কিডনির জন্য ক্ষতিকর?
উত্তর:
লবণে থাকা সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়ায়, যা কিডনির রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে কিডনির ফিল্টারিং ক্ষমতা কমে যায়।
প্রশ্ন ৬: কিডনি নষ্ট হচ্ছে কিনা তা কিভাবে বুঝব?
উত্তর:
কিছু সাধারণ লক্ষণ হলো:
-
প্রস্রাবে পরিবর্তন
-
শরীরে ফোলাভাব
-
ক্লান্তি ও দুর্বলতা
-
ত্বকে চুলকানি
-
ক্ষুধামান্দ্য
-
শ্বাসকষ্ট
এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
প্রশ্ন ৭: নিয়মিত কোন পরীক্ষাগুলো করলে কিডনির অবস্থা জানা যাবে?
উত্তর:
-
রক্তে Creatinine ও eGFR
-
প্রস্রাবে প্রোটিন বা অ্যালবুমিন
-
Blood Urea Nitrogen (BUN)
-
Urine Routine Test
এছাড়া প্রয়োজনে আলট্রাসাউন্ড ও রক্তচাপ পরিমাপ জরুরি।
প্রশ্ন ৮: কিডনি সুস্থ রাখতে প্রতিদিন কী কী অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে?
উত্তর:
-
পর্যাপ্ত পানি পান করা
-
সুষম ও কম লবণযুক্ত খাবার খাওয়া
-
প্রস্রাব চেপে না রাখা
-
নিয়মিত ব্যায়াম করা
-
রক্তচাপ ও সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা
-
ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
-
নিয়মিত কিডনি চেকআপ করানো
প্রশ্ন ৯: ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে কিডনি কতটা ঝুঁকিতে পড়ে?
উত্তর:
ডায়াবেটিস ও হাইপারটেনশন কিডনির প্রধান দুটি শত্রু। এদের প্রভাবে কিডনির ছোট রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে ধীরে ধীরে কিডনি নষ্ট হতে থাকে। এজন্য এসব রোগ থাকলে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হয়।
প্রশ্ন ১০: খাদ্যাভ্যাসে কোন পরিবর্তন কিডনি সুস্থ রাখতে সাহায্য করে?
উত্তর:
-
অতিরিক্ত লবণ ও চিনি পরিহার করা
-
প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলা
-
পর্যাপ্ত শাকসবজি ও আঁশযুক্ত খাবার খাওয়া
-
ক্যাফেইন ও কৃত্রিম পানীয় কমানো
-
প্রোটিনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা (বিশেষত কিডনি সমস্যা থাকলে)
