Skip to content
ডিফথেরিয়া

ডিফথেরিয়া: কী, কিভাবে হয় এবং প্রতিরোধের উপায়

ডিফথেরিয়া (Diphtheria) একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা মূলত Corynebacterium diphtheriae নামক ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে হয়। রোগটি সাধারণত গলা ও শ্বাসনালীতে সংক্রমণ ঘটিয়ে থাকে, তবে এটি ত্বক ও শরীরের অন্যান্য অংশেও প্রভাব ফেলতে পারে। ইতিহাসে এই রোগ মহামারী আকারে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছে, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে। বর্তমানে ভ্যাকসিনের কারণে রোগটির প্রকোপ অনেক কমেছে, তবে এখনো বিশ্বের অনেক দেশে এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি।

ডিফথেরিয়া কী:

ডিফথেরিয়া হল একটি তীব্র ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত হলে রোগীর গলা ও টনসিলের চারপাশে ধূসর বা সাদা রঙের একটি পুরু আবরণ তৈরি হয়, যা শ্বাসপ্রশ্বাসে সমস্যা সৃষ্টি করে। ব্যাকটেরিয়াটি শরীরে একটি বিষাক্ত টক্সিন ছেড়ে দেয়, যা হার্ট, স্নায়ুতন্ত্র এবং কিডনিকে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে।

রোগের কারণ:

১. কারক জীবাণু

ডিফথেরিয়ার প্রধান কারণ হলো Corynebacterium diphtheriae, যা একটি Gram-positive, non-motile, rod-shaped ব্যাকটেরিয়া।
এই ব্যাকটেরিয়াটি তিনটি প্রধান ধরনের হতে পারে:

  • Gravis (গুরুতর আকার, বেশি টক্সিন উৎপাদনকারী)

  • Intermedius

  • Mitis (তুলনামূলক হালকা)

এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে Corynebacterium ulcerans এবং Corynebacterium pseudotuberculosis-ও একই ধরনের রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

২. সংক্রমণের উৎস ও ছড়ানোর পথ

ডিফথেরিয়া সাধারণত শ্বাসনালী সংক্রমণ (respiratory tract infection) আকারে দেখা দেয়, তবে ত্বক বা ক্ষতস্থলেও হতে পারে।
সংক্রমণের মূল পথ হলো:

  • ড্রপলেট সংক্রমণ: কাশি, হাঁচি, বা কথা বলার সময় বাতাসে ছড়ানো ক্ষুদ্র লালা কণার মাধ্যমে

  • সরাসরি সংস্পর্শ: রোগীর ব্যবহৃত কাপড়, তোয়ালে, বা অন্যান্য জিনিসপত্র

  • ক্ষত সংস্পর্শ: রোগীর ত্বকের ঘা বা ক্ষত স্পর্শ করার মাধ্যমে

৩. রোগ সৃষ্টির প্রক্রিয়া

Corynebacterium diphtheriae ব্যাকটেরিয়া মূলত শ্বাসনালীর শ্লেষ্মা ঝিল্লিতে বসতি স্থাপন করে।
এটি diphtheria toxin নামক একটি শক্তিশালী exotoxin উৎপাদন করে, যা আসল ক্ষতির মূল কারণ।
প্রক্রিয়াটি নিম্নরূপ:

  1. ব্যাকটেরিয়া শ্বাসনালী বা ত্বকে বসতি স্থাপন করে।

  2. ব্যাকটেরিয়া tox gene নামক একটি জিনের মাধ্যমে টক্সিন উৎপাদন করে, যা সাধারণত bacteriophage দ্বারা কোডেড।

  3. এই টক্সিন কোষের ভিতরে protein synthesis বন্ধ করে দেয়, বিশেষ করে elongation factor-2 (EF-2) নিষ্ক্রিয় করে।

  4. এর ফলে আক্রান্ত স্থানে necrosis (কোষমৃত্যু) ও pseudomembrane (ঘন ধূসর আবরণ) তৈরি হয়।

  5. টক্সিন রক্তে মিশে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ (যেমন হৃদপিণ্ড, স্নায়ুতন্ত্র, কিডনি) ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৪. টক্সিনের প্রভাব
  • স্থানীয় প্রভাব:

    • গলা ও টনসিল ফুলে যাওয়া

    • শ্বাসকষ্ট

    • গলার ভেতরে ধূসর-সাদা pseudomembrane তৈরি

  • সিস্টেমিক প্রভাব:

    • Myocarditis (হৃদপিণ্ডের প্রদাহ)

    • Peripheral neuropathy (স্নায়ুর ক্ষতি)

    • Kidney damage

    • মারাত্মক ক্ষেত্রে শ্বাসরোধ ও মৃত্যু

৫. ঝুঁকির কারণ
  • টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাদান

  • জনাকীর্ণ পরিবেশ

  • অপুষ্টি

  • খারাপ স্বাস্থ্যবিধি

  • রোগীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ

৬. প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ

ডিফথেরিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো DTP বা DTaP ভ্যাকসিন (Diphtheria, Tetanus, Pertussis)।
শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময়ে একাধিক ডোজ দেওয়া হয় এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য বুস্টার ডোজ প্রয়োজন।

রোগের লক্ষণ:

ডিফথেরিয়ার লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ২–৫ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। প্রধান লক্ষণগুলো হলো:

১. শ্বাসনালী ডিফথেরিয়ার লক্ষণ

শ্বাসনালীতে সংক্রমণ হলে সাধারণত প্রথমে হালকা সর্দি-কাশির মতো শুরু হয়, কিন্তু দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করে।

প্রাথমিক লক্ষণ
  • গলা ব্যথা ও গিলতে অসুবিধা

  • হালকা জ্বর (38°C বা 100.4°F এর আশেপাশে)

  • ক্লান্তি ও দুর্বলতা

  • গলা লালচে হওয়া

বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ
  • গলার ভেতরে পুরু ধূসর বা সাদা “pseudomembrane” তৈরি হওয়া

    • এটি শক্তভাবে লেগে থাকে, তুলতে গেলে রক্তপাত হয়

  • গলা ফুলে যাওয়া (severe neck swelling) — যাকে “bull neck” বলা হয়

  • শ্বাসকষ্ট বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া

  • কর্কশ বা ভাঙা কণ্ঠস্বর

  • নাক দিয়ে রক্তমিশ্রিত স্রাব (যদি নাসিকা আক্রান্ত হয়)

পরবর্তী জটিলতা থেকে আসা লক্ষণ
  • হৃদপিণ্ডে প্রদাহ (myocarditis) → বুকে ব্যথা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন

  • স্নায়ুর ক্ষতি (neuropathy) → হাত-পা দুর্বল হওয়া, গিলতে অসুবিধা

  • শ্বাসনালীর ব্লক হয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া

২. ত্বকের ডিফথেরিয়ার লক্ষণ

এই ধরনটি তুলনামূলক কম মারাত্মক, তবে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

  • ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি বা ঘা

  • ক্ষতের উপর ধূসর রঙের আবরণ

  • ধীরে ধীরে সেরে ওঠা ক্ষত

  • কিছু ক্ষেত্রে হালকা জ্বর ও অবসাদ

৩. অবস্থা অনুযায়ী সময়রেখা
    • Incubation period (লক্ষণ প্রকাশের আগে সময়): সাধারণত ২–৫ দিন (কখনও ১০ দিন পর্যন্ত)

    • প্রাথমিক পর্যায়: গলা ব্যথা, জ্বর, দুর্বলতা

    • তীব্র পর্যায়: pseudomembrane, শ্বাসকষ্ট, গলার ফুলে যাওয়া

    • জটিলতা পর্যায়: হৃদপিণ্ড, স্নায়ু ও কিডনির ক্ষতি

রোগের জটিলতা:

যদি ডিফথেরিয়ার দ্রুত চিকিৎসা না করা হয়, তবে এটি জীবনহানিকর হতে পারে। সম্ভাব্য জটিলতাগুলো হলো:

১. শ্বাসনালীর জটিলতা
  • শ্বাসনালী ব্লক (Airway obstruction)
    গলার ভেতরে তৈরি হওয়া পুরু ধূসর pseudomembrane শ্বাসনালী বন্ধ করে দিতে পারে, ফলে রোগী শ্বাস নিতে না পেরে মারা যেতে পারে।

  • Severe laryngeal swelling → গলার ভিতর ও বাইরে অতিরিক্ত ফোলা (bull neck), যা শ্বাসরোধের ঝুঁকি বাড়ায়।

২. হৃদপিণ্ডের জটিলতা
  • Myocarditis → হৃদপিণ্ডের পেশীতে প্রদাহ, যা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন (arrhythmia) বা হৃৎপিণ্ড বিকলতা (heart failure) ঘটাতে পারে।

  • মারাত্মক ক্ষেত্রে হঠাৎ হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে মৃত্যু হতে পারে।

  • সাধারণত সংক্রমণের ১–২ সপ্তাহ পর এসব সমস্যা দেখা দিতে শুরু করে।

৩. স্নায়বিক জটিলতা
  • Peripheral neuropathy → হাত-পায়ের দুর্বলতা বা অবশভাব

  • Palatal paralysis → গিলতে সমস্যা, নাক দিয়ে খাবার বের হওয়া

  • Ocular paralysis → চোখের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণে সমস্যা

  • গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাস নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ু (phrenic nerve) আক্রান্ত হয়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

৪. কিডনির জটিলতা
  • Acute tubular necrosis → কিডনির টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া

  • প্রস্রাবের পরিমাণ হঠাৎ কমে যাওয়া (oliguria)

  • ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়া

৫. রক্তসংক্রান্ত জটিলতা
  • Disseminated intravascular coagulation (DIC) → শরীরে অস্বাভাবিকভাবে রক্ত জমাট বাঁধা ও রক্তক্ষরণ

  • মারাত্মক ক্ষেত্রে শক ও অঙ্গ বিকলতা

৬. মৃত্যুর ঝুঁকি
    • চিকিৎসা না করলে মৃত্যুহার ৫%–২০% পর্যন্ত হতে পারে, শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে আরও বেশি।

    • মৃত্যুর প্রধান কারণ হলো শ্বাসরোধ বা হৃদপিণ্ড ব্যর্থতা।

রোগ নির্ণয়:

ডিফথেরিয়া নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক নিম্নলিখিত পদ্ধতি ব্যবহার করেন:

১. ক্লিনিক্যাল নির্ণয়

ডিফথেরিয়ার ক্ষেত্রে কিছু বৈশিষ্ট্যপূর্ণ লক্ষণ আছে, যা দেখে ডাক্তার প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করেন:

  • গলার ভেতরে শক্তভাবে লেগে থাকা ধূসর বা সাদা pseudomembrane

  • গলার অতিরিক্ত ফোলা (bull neck)

  • গিলতে অসুবিধা ও শ্বাসকষ্ট

  • হালকা জ্বরের সাথে অতিরিক্ত দুর্বলতা

  • রোগীর টিকাদানের ইতিহাস জানা

২. ল্যাবরেটরি নির্ণয়

রোগ নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়।

(ক) নমুনা সংগ্রহ
  • গলা বা নাকের সোয়াব (throat/nasal swab)

  • ত্বকের ক্ষতের সোয়াব (cutaneous diphtheria হলে)

(খ) মাইক্রোবায়োলজিকাল পরীক্ষা
  1. Gram stain → Corynebacterium diphtheriae হলো Gram-positive, club-shaped rods

  2. Culture → বিশেষ মিডিয়া (যেমন Löffler’s medium, Tellurite agar) ব্যবহার করে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি করা হয়

  3. Colony characteristics → ধূসর-কালো রঙের কলোনি

(গ) টক্সিন সনাক্তকরণ
  • Elek’s test → ব্যাকটেরিয়া টক্সিন উৎপাদন করছে কি না তা পরীক্ষার জন্য একটি বিশেষ ইমিউনোডিফিউশন টেস্ট

  • PCR (Polymerase Chain Reaction) → tox gene শনাক্ত করা

  • ELISA বা Immunoassay → টক্সিনের উপস্থিতি নির্ণয়

৩. রক্ত পরীক্ষা
  • সংক্রমণের তীব্রতা ও অঙ্গ ক্ষতি বোঝার জন্য CBC, renal function test, cardiac enzymes করা হতে পারে

৪. ভিন্ন রোগ থেকে আলাদা করা

ডিফথেরিয়াকে নিচের রোগগুলোর সাথে বিভ্রান্ত করা যেতে পারে, তাই আলাদা করতে হয়:

  • Streptococcal pharyngitis

  • Infectious mononucleosis

  • Acute epiglottitis

  • Vincent’s angina

৫. গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
    • ডিফথেরিয়া সন্দেহ হলে পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা না করে তৎক্ষণাৎ antitoxin এবং অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করতে হয়

    • কারণ দেরি হলে টক্সিন শরীরে ছড়িয়ে মারাত্মক জটিলতা তৈরি করতে পারে

চিকিৎসা পদ্ধতি:

ডিফথেরিয়ার চিকিৎসায় দুটি বিষয় জরুরি:

১. অ্যান্টিটক্সিন থেরাপি
  • এটি হলো হর্স-সিরাম থেকে প্রস্তুত করা ইমিউনোগ্লোবুলিন, যা রক্তে থাকা টক্সিনকে নিষ্ক্রিয় করে।

  • যত দ্রুত সম্ভব দিতে হয় — আদর্শভাবে রোগ সন্দেহ হওয়ার সাথেসাথে, পরীক্ষার রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা না করে।

  • ইনট্রাভেনাস বা ইনট্রামাসকুলার পদ্ধতিতে দেওয়া হয়, ডোজ রোগের তীব্রতা ও সময়কাল অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।

  • দেওয়ার আগে অ্যালার্জি টেস্ট করতে হয়, কারণ এটি সিরাম সিকনেস বা অ্যানাফাইল্যাক্সিস ঘটাতে পারে।

২. অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি

ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস ও সংক্রমণ ছড়ানো রোধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়:

  • Erythromycin → 40–50 mg/kg/day, 14 দিন

  • Penicillin G procaine → 14 দিন

  • প্রয়োজনে কোর্স শেষে কালচার করে নিশ্চিত করা হয় যে জীবাণু সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে।

৩. শ্বাসনালী ব্যবস্থাপনা
  • গলার pseudomembrane বড় হলে শ্বাসনালী ব্লক হয়ে যেতে পারে, তাই জরুরি পরিস্থিতিতে:

    • এন্ডোট্র্যাকিয়াল ইন্টুবেশন

    • অথবা ট্র্যাকিওটমি করা হতে পারে

  • অক্সিজেন থেরাপি ও শ্বাস সহায়ক ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়।

৪. সহায়ক চিকিৎসা
  • পূর্ণ বিশ্রাম

  • তরল ও পুষ্টিকর খাদ্য

  • জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ

  • হৃদপিণ্ড, কিডনি ও স্নায়ুর কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ

৫. আইসোলেশন ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ
  • রোগীকে অন্তত ২ সপ্তাহ বা কালচার নেগেটিভ হওয়া পর্যন্ত আলাদা রাখা

  • স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকা আপডেট থাকা জরুরি

  • রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের প্রফিল্যাকটিক অ্যান্টিবায়োটিক ও প্রয়োজন হলে বুস্টার ডোজ দেওয়া

৬. পরবর্তী যত্ন

    • রোগ সেরে যাওয়ার পর টক্সিন-নিরপেক্ষ রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না, তাই রোগীকে সম্পূর্ণ ডোজে DTP/DTaP ভ্যাকসিন দিতে হয়।

ডিফথেরিয়ার প্রতিরোধ:

ডিফথেরিয়া প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান।

১. টিকাদান — প্রধান প্রতিরোধ ব্যবস্থা

ডিফথেরিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হলো টিকা। সাধারণত এটি সম্মিলিত ভ্যাকসিন আকারে দেওয়া হয়:

  • DTP / DTaP → (Diphtheria, Tetanus, Pertussis)

  • শিশুদের জন্য ৫ ডোজে দেওয়া হয়:

    • ২ মাস

    • ৪ মাস

    • ৬ মাস

    • ১৫–১৮ মাস

    • ৪–৬ বছর

  • কিশোর ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য Td বা Tdap বুস্টার প্রতি ১০ বছরে একবার নিতে হয়।

টিকা নেওয়া থাকলেও সময়মতো বুস্টার ডোজ না নিলে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।

২. সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা
  • রোগীকে দ্রুত আইসোলেশন (আলাদা রাখা)

  • রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র (তোয়ালে, চামচ, বালিশ) জীবাণুমুক্ত করা

  • ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে আসা সবাইকে প্রফিল্যাকটিক অ্যান্টিবায়োটিক (Erythromycin বা Penicillin) দেওয়া

  • সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের টিকা নেওয়া আছে কিনা যাচাই করে প্রয়োজন হলে বুস্টার ডোজ দেওয়া

৩. স্বাস্থ্য সচেতনতা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম
  • জনসাধারণকে ডিফথেরিয়ার লক্ষণ ও ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা

  • টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায়

  • রোগের প্রাদুর্ভাব হলে দ্রুত epidemic control measures নেওয়া

  • স্বাস্থ্যকর্মীদের টিকাদান সম্পূর্ণ থাকা নিশ্চিত করা

৪. ব্যক্তিগত প্রতিরোধ ব্যবস্থা
  • অসুস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে দূরে থাকা

  • কাশি বা হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা

  • হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা

  • নিজের ও পরিবারের টিকাদানের সময়সূচি মেনে চলা

বিশ্বে ডিফথেরিয়ার বর্তমান অবস্থা:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০-এর দশকে বিশ্বব্যাপী ডিফথেরিয়ার উল্লেখযোগ্য প্রাদুর্ভাব ছিল, তবে টিকাদানের ফলে এটি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। তবুও আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের কিছু দেশে মাঝে মাঝে প্রাদুর্ভাব ঘটে, বিশেষ করে যেখানে টিকাদান কাভারেজ কম।

বাংলাদেশে ডিফথেরিয়ার অবস্থা:

বাংলাদেশে ২০১৭ সালে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ডিফথেরিয়ার প্রাদুর্ভাব ঘটে, যেখানে শত শত মানুষ আক্রান্ত হয় এবং অনেকের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে গণটিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এটি প্রমাণ করে, টিকাদান ব্যবস্থায় সামান্য ফাঁক থাকলেই রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ডিফথেরিয়া সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  1. টিকা না নেওয়া ব্যক্তি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

  2. রোগী সুস্থ হলেও ৬ সপ্তাহ পর্যন্ত ব্যাকটেরিয়া ছড়াতে পারে।

  3. প্রাপ্তবয়স্কদেরও প্রতি ১০ বছরে বুস্টার ডোজ নেওয়া উচিত।

  4. রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হালকা হলেও দ্রুত প্রাণঘাতী হতে পারে।

  5. ডিফথেরিয়া মূলত দরিদ্র ও জনবহুল এলাকায় বেশি হয়।

ডিফথেরিয়া একটি প্রতিরোধযোগ্য কিন্তু মারাত্মক রোগ। একমাত্র কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হলো সময়মতো টিকাদান এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। আমাদের সবার দায়িত্ব হলো—নিজে টিকা নেওয়া, সন্তানদের টিকাদান নিশ্চিত করা এবং ডিফথেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের সময় সচেতন থাকা। সচেতনতা ও টিকাদানই পারে এই প্রাণঘাতী রোগ থেকে আমাদের এবং আমাদের সমাজকে রক্ষা করতে।

…………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………….

ডিফথেরিয়া – সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ)

প্রশ্ন ১: ডিফথেরিয়া কী?

ডিফথেরিয়া একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ, যা Corynebacterium diphtheriae ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হয়। এটি মূলত গলা ও শ্বাসনালীতে আক্রমণ করে এবং একটি বিষাক্ত টক্সিন উৎপাদন করে, যা হৃদপিণ্ড, স্নায়ু ও অন্যান্য অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

art=”421″ data-end=”457″>প্রশ্ন ২: ডিফথেরিয়া কিভাবে হয়?
  • কাশি, হাঁচি বা কথা বলার সময় বাতাসে ছড়ানো জীবাণু শ্বাসের সাথে প্রবেশ করলে

  • রোগীর লালা, নাকের স্রাব, বা ব্যবহৃত জিনিসের মাধ্যমে

  • ত্বকের ক্ষত স্পর্শ করলে (cutaneous diphtheria)

data-start=”652″ data-end=”681″>প্রশ্ন ৩: এর লক্ষণ কী কী?
  • গলা ব্যথা ও গিলতে কষ্ট

  • হালকা জ্বর ও দুর্বলতা

  • গলার ভেতরে পুরু ধূসর/সাদা স্তর (pseudomembrane)

  • গলার বাইরে ফোলা (bull neck)

  • শ্বাসকষ্ট

data-end=”887″>প্রশ্ন ৪: ডিফথেরিয়া কি মারাত্মক হতে পারে?

হ্যাঁ। চিকিৎসা না করলে বা দেরি হলে এটি শ্বাসরোধ, হৃদপিণ্ডের সমস্যা, স্নায়ু ক্ষতি ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

প্রশ্ন ৫: ডিফথেরিয়া প্রতিরোধের উপায় কী?
  • টিকা নেওয়া: শিশুদের DTP/DTaP ভ্যাকসিন ও প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি ১০ বছরে বুস্টার ডোজ

  • রোগীকে আলাদা রাখা

  • রোগীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের অ্যান্টিবায়োটিক ও বুস্টার ডোজ দেওয়া

  • ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মানা (হাত ধোয়া, কাশি/হাঁচির সময় মুখ ঢেকে রাখা)

প্রশ্ন ৬: ডিফথেরিয়া হলে কী করা উচিত?

অবিলম্বে হাসপাতালে যেতে হবে। ডাক্তার দ্রুত diphtheria antitoxin ও অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা শুরু করবেন। নিজে থেকে চিকিৎসা শুরু করলে সময় নষ্ট হবে এবং জটিলতার ঝুঁকি বাড়বে।